UA-199656512-1
top of page

শ্রীরাম শূদ্রকে দণ্ড দিয়েছিলেন কেন ?

Updated: Oct 21, 2020

শ্রীরাম কতৃক শূদ্র তপস্বীকে দণ্ডদান

সনাতন ধর্মকে কটাক্ষকৃত অপপ্রচারের মধ্যে অন্যতম একটি হলো; শ্রীরামচন্দ্র এক শূদ্র তপস্বীকে বিনাকারণে দণ্ড দিয়েছিলেন। ইউটিউব, সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে অপপ্রচারের জুড়ি নেই। কিছু সিরিয়ালও নির্মিত হয়েছে যা সম্পূর্ণ অশাস্ত্রীয় এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আম্বেদকরের মতাদর্শী একশ্রেণীর দলিতগোষ্ঠিও নিজেদের পাল্লা ভারি করার উদ্দেশ্যে এধরনের কথা প্রচার করে থাকে।



কিন্তু যে রামরাজ্যের কথা আমরা শুনে থাকি সেখানে কি আসলেই এমন জাতিভেদ, বর্ণভেদ ছিল ? মর্যাদাপুরুষোত্তম ভগবান শ্রীরামের কার্যকলাপে এধরণের অপবাদপ্রদানকারীরা কি আদৌ শাস্ত্র জানে?


রামচরিত্র সম্বলিত সর্বাপেক্ষা প্রামাণিক গ্রন্থ মহর্ষি বাল্মিকী রচিত রামায়ণ এবং গোস্বামী তুলসীদাস রচিত ‘রামচরিতমানস’।


“কস্যাৎ যোন্যাৎ তপোবৃদ্ধ বর্তসে দৃড়বিক্রম।

কৌতুহলাত্বাৎ পৃচ্ছামি রামো দাশরথি অর্হম ।।

কোছর্থো মনীষিতজত্যং স্বর্গলাভোঅপরোথবা।

বরাশ্রয়ো যদর্থং ত্বৎ তপস্যন্ত্যৈঃ সুদুশ্চরম ।।

যমাশ্রিত্য তপস্যপ্তং শোতুমিচ্ছামি তাপস।

ব্রাহ্মণো বাসি ভদ্রং তে ক্ষত্রিয় বাসি দু্র্জ্জয়ঃ।

বৈশ্যস্তৃতীয়ো বর্ণো বা শূদ্রো বা সত্যবাগভব।।(রামায়ণ,উত্তরকাণ্ড ৮৮/১৬-১৮)



অনুবাদ: তপোবৃদ্ধ, আমি দশরথের পুত্র রাম কৌতুহলবশতঃ আমি আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি দৃঢ়বিক্রম, আপনি চতুর্বর্ণের মধ্যে কোন বর্ণে জন্মিয়াছেন? আপনি কোন বরলাভার্থে অন্যের দুঃসাধ্য তপস্যা করিতেছেন? স্বর্গলাভ অথবা অন্য কোন বর আপনার প্রার্থনীয়?

অধোমুখোস্থিত তপস্বী তখন নরশ্রেষ্ঠ দাশরথিকে বললেন-


“তস্য তদ্বচনং শ্রুত্বা রামস্যাক্লিষ্টকর্মণঃ।

অর্ব্বাকৃশিরাস্তথাভূতো বাক্যমেতদুবাচ হ।

শূদ্রযোন্যাঃ প্রজাতেহস্মি তপ উগ্রং সমাস্থিতঃ।

দেবত্বৎ প্রার্থয়ে রাম সশরীরো মহাযশঃ।।

ন মিথ্যাহং বদে রাম দেবলোকজিগীষয়া।

শূদ্রং মাং বিদ্ধি কাকুৎস্থ শম্বুকং নামস্তঃ।।”( রামায়ণ,উত্তরকাণ্ড ৮৯/১-৩)


অনুবাদ: অক্লিষ্টকর্মা রামের কথা শুনিয়া সেই তপস্বী অধোমুখে থাকিয়াই কহিলেন- “মহাযশস্মিন রাম, আমি শূদ্রজাতিতে জন্মিয়াছি। কঠোর তপস্যার দ্বারা দেবলোক জয় এবং সশরীরে দেবতা হইবার বাসনা করি। আমি আপনার নিকট মিথ্যা বলিতেছি না। কাকুৎস, আমার নাম শম্ভুক


“ভাষস্তন্য শূদ্রন্য খড়গং সুরুচিরপ্রভম্।

নিষ্কাষ্য কোশোদ্বিমলং শিরশ্চিচ্ছেদ রাঘবঃ।। (রামায়ণ,উত্তরকাণ্ড ৮৯/৪)



অনুবাদ: শম্বুকের কথা শেষ হেইতে না হইতেই রঘুনন্দন রাম কোষ হইতে উজ্জল বিমল খড়গ বাহির করিয়া তাহার মস্তক কাটিয়া ফেলিলেন।

লক্ষণীয়, দেবলোক জয় এবং সশরীরে দেবতা হওয়ার বাসনা কেবল অসুর অথবা রাক্ষসেরাই করে। আর ভগবানের অবতার ধারনের অন্যতম উদ্দেশ্যই হচ্ছে এধরণের দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করা ‘বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম’।

রাবণ এবং কুম্ভকর্ণও স্বর্গলোক জয় এবং অমরত্ব লাভের আশায় ঘোর তপস্যা করেছিল। পরবর্তিতে শ্রীরাম তাদের বধ করেছিলেন। অথচ রাবণ, কুম্ভকর্ণ জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন। কিন্তু শ্রীরাম ব্রাহ্মণ হত্যা করেছিলেন এমন প্রচারণা তো কেউ চালান না!

সুতরাং দেখা যাচ্ছে দণ্ডদানের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ-শূদ্র কোনো বিষয় না। অপরাধী যে বর্ণেরই হোক আদর্শ রাজা বৈষম্য করেননা।

এছাড়া আমরা দেখতে পাই, হিরণ্যাক্ষ, হিরণ্যকশিপু, মহিষাসুর, শুম্ভ-নিশুম্ভ আদি যারাই অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কঠোর তপস্যা করেছে তাদের সকলকেই শ্রীভগবান কোনো অবতার ধারণ করে বধ করেছেন। তাই শ্রীরাম শূদ্রের প্রতি জাতিভেদ করেছেন এমন ভাবাই অবান্তর।

প্রকৃতপক্ষে স্বর্গলোক জয়, অমরত্ব লাভের বাসনায় তপস্যার পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকে। এধরনের অতিমানবিক ক্ষমতা পেয়ে দুর্বলের উপর নির্যাতন, নারী অপহরণ-বলাৎকার, অরাজকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই শ্রীভগবান এধরনের কঠোর তপস্যায় নিষেধাজ্ঞা করেছেন:



অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ৷

দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তাঃ কামরাগবলান্বিতাঃ৷৷

কর্ষয়ন্তঃ শরীরস্থং ভূতগ্রামমচেতসঃ৷

মাং চৈবান্তঃশরীরস্থং তান্বিদ্ধ্যাসুরনিশ্চয়ান্৷৷ (ভগবদগীতা ১৭/৫-৬)


অর্থ: দম্ভ ও অহংঙ্কারযুক্ত এবং কামনা ও আসক্তির প্রভাবে বলান্বিত হয়ে যে সমস্ত অবিবেকী ব্যক্তিরা তাদের দেহ ও ইন্দ্রিয় সমূহকে এবং অন্তরস্থ পরমাত্মাকে কষ্ট দিয়ে শাস্ত্রবিরুদ্ধ ঘোর তপস্যার অনুষ্ঠান করে, তাদেরকে নিশ্চিতভাবে আসুরিক বলে জানবে।

এরপরেও যদি কোনো রামবিদ্বেষী মনে করে শ্রীরাম জাতিভেদ করতেন তবে তাকে জানতে হবে শ্রীরাম শবরী নামক এক আদিবাসী কন্যার উপর কৃপাবর্ষণ করেন। মতঙ্গ মুনির শিষ্যা এই শবরী তপস্বিনী ছিলেন এবং তপস্যায় সিদ্ধিলাভও করেছিলেন। “শবরী বৃদ্ধা রামায়…অদ্য প্রাপ্তা তপঃসিদ্ধি”( রামায়ণ,অরণ্যকাণ্ড ৭৪/৬,১০,১১)

কেবল শূদ্র হয়ে তপস্যা করাটাই যদি অপরাধ হতো তবে শ্রীরাম এই শবরীকেও দণ্ড দিতেন। কিন্তু শবরীর তপস্যার পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিলনা। উপরন্তু তপস্যায় সিদ্ধিলাভের পরেও শবরী নিজেকে একজন অধম জাতির অধম নারী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন এবং প্রভুর কৃপা প্রার্থনা করেছিলেন।



“কেহি বিধি অস্তুতি করৌঁ তুমহারী। অধম জাতি মৈঁ জড়মতি ভারী।।

অধম তে অধম অধম অতি নারী। তিনহ মহঁ মৈঁ মতিমন্দ অঘারী।।

কহ রঘুপতি সুনু ভামিনি বাতা। মানউঁ এক ভগতি কর নাতা।।

জাতি পাঁতি কুল ধর্ম বড়াঈ। ধন বল পরিজন গুণ চতুরাঈ ।।

ভগতি হীন নর সোহই কৈসা। বিনু জল বারিদ দেখিঅ জৈসা।।”(শ্রীরামচরিতমানস, অরণ্যকাণ্ড ৩৪/১-৩)


শ্রীরামচন্দ্র শবরীকে বলেন, “হে ভামিনী! আমার কাছে একমাত্র ভক্তির সম্বন্ধই স্বীকৃতি লাভ করে। কেউ যদি জাতি, শ্রেণী, কুল, ধর্ম, মান, ধনসম্পদ, বল, কুটুম্ব, গুণ ও চাতুর্যসম্পন্নও হয় কিন্তু তার ভক্তি না থাকে তখন সে জলবিহীন মেঘসম অর্থহীন প্রতিপন্ন হয়।” প্রভু রাম তাঁকে নবধা ভক্তিও প্রদান করেন “নবধা ভগতি কহউঁ তেহি পাহীঁ”(৩৪/৪)

এছাড়া শৃঙ্গবেরপুরে নিষাদরাজ(উপজাতি) গুহক নামে শ্রীরামের এক অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন।


“তত্র রাজা গুহো নাম রামস্যাত্মসমঃ সখা।

নিষাদজাত্যো বলবান স্থপতিশ্চেতি বিশ্রুতঃ।।(রামায়ণ,অরণ্যকাণ্ড ৫০/৩৩)


শ্রীরাম যদি জাতিভেদই করতেন তাহলে কখনো উপজাতি বন্ধু রাখতেন না।

তাই কিছু স্বার্থান্বেষী ইউটিউবার/ ধর্মান্তরিত মূর্খের কথায় কান না দিয়ে প্রামাণিক শাস্ত্র পড়ুন এবং অপপ্রচার রোধ করুন।

শ্রীসীতারামাভ্যাং নমঃ

শ্রীরামচন্দ্রায় নমঃ

শ্রীরামভদ্রায় নমঃ



131 views0 comments
Be Inspired
bottom of page